একটা চাকরির সার্কুলারে শত শত সিভি জমা পড়ে, আর প্রথম বাছাইয়ে প্রতিটা সিভির পেছনে নিয়োগকর্তারা খুব বেশি সময় দেন না। এই অল্প সময়ে তাঁরা খোঁজেন কয়েকটা নির্দিষ্ট জিনিস: আপনি কে, কী পড়েছেন, কী করেছেন আর এই পদের সাথে আপনার মিল কতটা। ভালো সিভি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দ্রুত খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
এই লেখায় আছে বাংলাদেশে চাকরির জন্য সিভি লেখার নিয়ম, অংশ ধরে ধরে। শেষে পুরো সিভি ফরমেটের একটা কাঠামোও আছে, যেটা দেখে নিজেরটা সাজাতে পারবেন।
সিভি লেখার আগে তিনটা মূল কথা
এক, সিভি ইংরেজিতে লিখুন। বাংলাদেশে বেসরকারি, ব্যাংক, এনজিও আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে সিভি ইংরেজিতেই দেওয়া নিয়ম। বাংলায় লিখবেন শুধু তখন, যখন জব সার্কুলারে বাংলা চাওয়া থাকে। এই লেখাটা বাংলায়, কিন্তু নিচের নমুনা লাইনগুলো ইংরেজিতে রাখা হয়েছে, কারণ আপনার সিভিতে সেগুলো ইংরেজিতেই যাবে।
দুই, একটা সিভি সব চাকরিতে চলে না। ব্যাংক, সরকারি চাকরি আর একটা সফটওয়্যার কোম্পানি আলাদা জিনিস খোঁজে। মূল সিভি একটা রাখুন, কিন্তু প্রতিটা আবেদনের আগে সার্কুলার পড়ে সারাংশ আর দক্ষতার অংশ মিলিয়ে নিন।
তিন, সাজসজ্জার চেয়ে পরিষ্কার লেখা জরুরি। রঙিন ডিজাইন, টেবিল আর আইকনে ভরা সিভি অনেক সময় নিয়োগের সফটওয়্যার (ATS) ঠিকমতো পড়তে পারে না। সহজ লেআউট, পরিষ্কার শিরোনাম আর সাধারণ ফন্ট ব্যবহার করুন।
সিভির অংশগুলো, সঠিক ক্রমে
1. নাম আর যোগাযোগের তথ্য
সবার উপরে বড় করে আপনার পুরো নাম। তার নিচে এক বা দুই লাইনে:
- মোবাইল নম্বর (যেটা সবসময় খোলা থাকে)
- ইমেইল ঠিকানা: নিজের নাম দিয়ে তৈরি ফরমাল ইমেইল দিন। "cutiepie99" ধরনের ঠিকানা প্রথম দেখাতেই খারাপ ছাপ ফেলে।
- বর্তমান ঠিকানা (শুধু এলাকা আর শহর দিলেই যথেষ্ট, যেমন Mirpur, Dhaka)
- LinkedIn প্রোফাইল থাকলে তার লিংক
ছবি দিলে উপরের এক কোণে পাসপোর্ট সাইজের পরিষ্কার, ফরমাল ছবি দিন। সেলফি, গ্রুপ ছবি থেকে কেটে নেওয়া ছবি বা ফিল্টার দেওয়া ছবি একদমই না।
2. ক্যারিয়ার অবজেক্টিভ বা সারাংশ
বাংলাদেশি সিভিতে সাধারণত শুরুতে "Career Objective" থাকে। সমস্যা হলো, বেশিরভাগ সিভিতে এটা একই রকম: "To build a career in a reputed organisation where I can utilise my skills…"। এই লাইন পড়ে নিয়োগকর্তা আপনার সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেন না।
এর বদলে 2-3 লাইনে লিখুন আপনি কোন পদ চাইছেন আর কেন আপনি উপযুক্ত:
Finance graduate from the University of Dhaka (CGPA 3.62) seeking a Management Trainee role in retail banking. Completed a 3-month internship in credit analysis at a private commercial bank and led a 40-member business club.
অভিজ্ঞ হলে "Career Objective"-এর বদলে "Professional Summary" লিখুন, আর বছরের অভিজ্ঞতা, মূল দক্ষতা আর একটা-দুটো বাস্তব অর্জন দিয়ে শুরু করুন।
3. শিক্ষাগত যোগ্যতা
ফ্রেশারদের জন্য এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ, তাই সারাংশের ঠিক পরেই দিন। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ডিগ্রি সবার উপরে:
- ডিগ্রির নাম আর বিষয় (BBA in Finance, BSc in CSE)
- প্রতিষ্ঠানের নাম
- পাসের বছর (চলমান হলে Expected 2026)
- ফলাফল: বিশ্ববিদ্যালয়ে CGPA 4.00-এর মধ্যে, SSC আর HSC-তে GPA 5.00-এর মধ্যে। স্কেল লিখে দিন, যেমন "CGPA 3.45 out of 4.00"।
SSC আর HSC-র ক্ষেত্রে বোর্ড আর পাসের বছর দিন। বাংলাদেশে নিয়োগকর্তারা, বিশেষ করে ব্যাংক আর সরকারি প্রতিষ্ঠান, অনেক সময় SSC আর HSC-র ফলাফল দেখেই ন্যূনতম যোগ্যতা যাচাই করেন।
4. কাজের অভিজ্ঞতা
অভিজ্ঞ প্রার্থীদের জন্য এটাই মূল অংশ, তাই শিক্ষার আগে দিন। প্রতিটা চাকরির জন্য: পদের নাম, প্রতিষ্ঠান, সময়কাল (মাস আর বছরসহ), তারপর 3-5টা বুলেট।
সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু দায়িত্বের তালিকা দেওয়া। "Responsible for customer service" না লিখে লিখুন আপনি কী করেছেন আর তার ফল কী হয়েছে:
Resolved 60+ customer queries a day over phone and email, keeping the team's response time under 2 hours.
সংখ্যা দিলে বুলেট বিশ্বাসযোগ্য হয়, কিন্তু শুধু সেই সংখ্যাই দিন যেটা ইন্টারভিউতে ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
ফ্রেশার হলে কী দেবেন? ইন্টার্নশিপ, থিসিস বা প্রজেক্ট, পার্ট-টাইম কাজ, টিউশনি, ক্লাব বা স্বেচ্ছাসেবী কাজ। এগুলোও অভিজ্ঞতা, শুধু ঠিকভাবে লিখতে হবে।
5. প্রশিক্ষণ আর সার্টিফিকেশন
পদের সাথে সম্পর্কিত কোর্সগুলোই দিন: কোর্সের নাম, প্রতিষ্ঠান আর বছর। এক দিনের ওয়ার্কশপ বা সম্পর্কহীন অনলাইন কোর্সের লম্বা তালিকা সিভির ওজন কমায়।
6. দক্ষতা
দুই-তিনটা ভাগে সাজান: কাজের দক্ষতা, সফটওয়্যার (MS Excel, Tally, Python ইত্যাদি) আর ভাষা। "Hard working", "Team player" ধরনের শব্দ এখানে দেবেন না। এগুলো প্রমাণ করতে হয় অভিজ্ঞতার বুলেট দিয়ে।
জব সার্কুলারে যে দক্ষতাগুলো চাওয়া হয়েছে আর যেগুলো সত্যিই আপনার আছে, সেগুলো সার্কুলারের ভাষাতেই লিখুন। অনেক প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার দিয়ে সিভি বাছাই করে, আর সফটওয়্যার এই কিওয়ার্ডগুলোই খোঁজে।
7. ব্যক্তিগত তথ্য
বাংলাদেশি সিভিতে সাধারণত শেষের দিকে "Personal Details" অংশ থাকে। এখানে কী দেবেন, তা নির্ভর করে চাকরির ধরনের উপর:
- বেশিরভাগ বেসরকারি চাকরিতে: জন্মতারিখ, জাতীয়তা আর স্থায়ী ঠিকানা (জেলা) যথেষ্ট।
- সরকারি আর অনেক ব্যাংকের আবেদনে: বাবা-মায়ের নাম, NID নম্বর, স্থায়ী আর বর্তমান ঠিকানা লাগতে পারে। সার্কুলার বা আবেদন ফরম দেখে দিন।
- যা দরকার নেই: উচ্চতা, ওজন, রক্তের গ্রুপ, ধর্ম আর বৈবাহিক অবস্থা, যদি না আলাদাভাবে চাওয়া হয়।
8. রেফারেন্স
দুজন রেফারেন্স দিন: শিক্ষক, সাবেক সুপারভাইজার বা যিনি আপনার কাজ সরাসরি দেখেছেন। নাম, পদবি, প্রতিষ্ঠান, ফোন আর ইমেইল দিন। আত্মীয়কে রেফারেন্স দেবেন না, আর দেওয়ার আগে তাঁর অনুমতি নিয়ে রাখুন।
সিভি ফরমেট: এক নজরে
নিচের ক্রমটা ফ্রেশারদের জন্য। অভিজ্ঞ হলে "Work Experience" অংশটা "Education"-এর আগে নিয়ে আসুন।
FULL NAME
Phone · Email · Area, City · LinkedIn
CAREER OBJECTIVE
2–3 lines: target role + why you fit
EDUCATION
Degree, Subject — University — Year — CGPA x.xx out of 4.00
HSC — College, Board — Year — GPA x.xx out of 5.00
SSC — School, Board — Year — GPA x.xx out of 5.00
EXPERIENCE / INTERNSHIP / PROJECTS
Role — Organisation — Month Year to Month Year
• What you did + result
TRAINING & CERTIFICATIONS
SKILLS (Job skills · Software · Languages)
PERSONAL DETAILS
REFERENCES (2)
পুরো সাজানো সিভি দেখতে চাইলে আমাদের নমুনাগুলো দেখুন। প্রতিটা নমুনার সাথে সেই পদের জন্য কোন বুলেট কাজ করে আর নিয়োগকর্তারা কী দেখেন, তাও লেখা আছে: ফ্রেশারদের সিভি নমুনা, ব্যাংকের চাকরির সিভি নমুনা, শিক্ষকের সিভি নমুনা আর সব সিভি নমুনা।
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি সিভি বাদ ফেলে
- বানান আর ব্যাকরণের ভুল। একটা ভুল বানান প্রমাণ করে আপনি খেয়াল করে পড়েননি। পাঠানোর আগে অন্তত দুবার পড়ুন, সম্ভব হলে আরেকজনকে দিয়ে পড়ান।
- সব চাকরিতে একই সিভি। প্রতিটা সার্কুলারের সাথে সারাংশ আর দক্ষতা মিলিয়ে নিন।
- তারিখে ফাঁক বা অসঙ্গতি। পড়াশোনা আর চাকরির সময়কাল যেন একটার সাথে আরেকটা মেলে।
- অতিরিক্ত ডিজাইন। টেবিল, দুই কলামের জটিল লেআউট আর ছবির ভেতরে লেখা নিয়োগের সফটওয়্যার অনেক সময় পড়তে পারে না।
- Word ফাইল পাঠানো। অন্য কম্পিউটারে খুললে লেআউট ভেঙে যেতে পারে। অন্যভাবে না বলা থাকলে PDF পাঠান।
- ফাইলের নাম "CV.pdf" বা "final final.pdf"। নিজের নাম দিয়ে ফাইলের নাম দিন: Rahim-Uddin-CV.pdf।
ইমেইলে সিভি পাঠানোর নিয়ম
অনেক সার্কুলারে বলা থাকে "সিভি ইমেইল করুন"। ভালো সিভিও অগোছালো ইমেইলের কারণে না খোলা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। চারটা জিনিস ঠিক রাখুন:
- সাবজেক্ট লাইন: সার্কুলারে কোনো ফরমেট বলা থাকলে হুবহু সেটাই লিখুন। না থাকলে পদের নাম আর আপনার নাম দিন।
- ইমেইলের মূল লেখা: তিন-চার লাইনের ছোট ভূমিকা, ইংরেজিতে। খালি ইমেইলে শুধু সংযুক্তি পাঠাবেন না।
- সংযুক্তি: সিভি PDF করে, নিজের নাম দিয়ে ফাইলের নাম। কভার লেটার চাইলে সেটাও আলাদা PDF।
- পাঠানোর আগে: নিজেকে একবার পাঠিয়ে দেখুন, ফাইল ঠিকমতো খোলে কি না।
নমুনা ইমেইল:
Subject: Application for Junior Executive, Sales — Sabbir Ahmed
Dear Hiring Manager,
I would like to apply for the Junior Executive, Sales position advertised on
Bdjobs on 10 October 2026. I recently completed my BBA in Marketing from
North South University and completed a three-month digital marketing internship.
My CV is attached for your consideration. I would be glad to discuss the role
at your convenience.
Sincerely,
Sabbir Ahmed
+880 1511-000007
Word ফরমেট ডাউনলোড না করে সিভি বানাবেন কীভাবে
অনেকেই "সিভি ফরমেট Word" খুঁজে একটা ফাইল নামান, তারপর নিজের তথ্য বসাতে গিয়ে লেআউট ভেঙে যায়, ফন্ট এলোমেলো হয়, আর PDF বানালে দেখতে অন্যরকম লাগে।
এর চেয়ে সহজ উপায় হলো একটা সিভি বিল্ডারে সরাসরি তথ্য লেখা। PromptCV-তে আপনি ফোন বা কম্পিউটার থেকে উপরের অংশগুলো ধরে ধরে তথ্য দেবেন, বাংলাদেশি চাকরির উপযোগী টেমপ্লেটে সাথে সাথে প্রিভিউ দেখবেন, আর AI দিয়ে বুলেটগুলো আরও ভালো করে লিখতে পারবেন। সিভি বানানো, এডিট আর প্রিভিউ ফ্রি। শুধু ক্লিন PDF ডাউনলোডের জন্য পে করবেন, কোনো সাবস্ক্রিপশন নেই।
আর আপনার বর্তমান সিভি নিয়োগের সফটওয়্যার ঠিকমতো পড়তে পারে কি না জানতে চাইলে ফ্রি ATS সিভি চেকার দিয়ে দেখে নিন। অ্যাকাউন্ট লাগে না, আর চেকটা পুরোপুরি আপনার ব্রাউজারেই চলে।
Frequently asked questions
- সিভি কি বাংলায় লিখব নাকি ইংরেজিতে?
- বাংলাদেশে বেসরকারি, ব্যাংক, এনজিও আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব চাকরিতে সিভি ইংরেজিতেই দিতে হয়। শুধু জব সার্কুলারে স্পষ্ট করে বাংলা চাওয়া থাকলে, যেমন কিছু সরকারি আবেদনে, বাংলায় লিখবেন।
- ফ্রেশারদের সিভি কত পৃষ্ঠার হওয়া উচিত?
- ফ্রেশারদের জন্য 1 পৃষ্ঠাই ভালো, খুব বেশি হলে 2 পৃষ্ঠা। অভিজ্ঞ প্রার্থীদের 2 পৃষ্ঠা স্বাভাবিক। পৃষ্ঠা ভরানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় তথ্য যোগ করবেন না।
- সিভিতে ছবি দেওয়া কি জরুরি?
- বাংলাদেশে বেশিরভাগ নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট সাইজের পরিষ্কার, ফরমাল ছবি আশা করেন, বিশেষ করে ব্যাংক আর সরকারি চাকরিতে। কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা বিদেশে আবেদনের সময় ছবি ছাড়া সিভি পাঠানোই নিয়ম। সার্কুলারে কী বলা আছে, আগে সেটা দেখুন।
- সিভিতে NID নম্বর আর জন্মতারিখ দিতে হয়?
- সরকারি আর অনেক ব্যাংকের আবেদনে লাগে। সাধারণ বেসরকারি চাকরির সিভিতে জন্মতারিখ দিলেই চলে, NID নম্বর না দেওয়াই নিরাপদ, যদি না চাওয়া হয়।
- সিভি কোন ফরম্যাটে পাঠাব, Word নাকি PDF?
- অন্যভাবে না বলা থাকলে PDF পাঠান। PDF সব ফোনে আর কম্পিউটারে একই রকম দেখায়, Word ফাইলের মতো লেআউট ভেঙে যায় না। ফাইলের নাম দিন আপনার নাম দিয়ে, যেমন Rahim-Uddin-CV.pdf।